অপরাধ

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাটে রোহিঙ্গাদের নাম, স্থানীয়দের ক্ষোভ

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাটে রোহিঙ্গাদের নাম, স্থানীয়দের ক্ষোভ

ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য নির্মিত খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে প্রকৃত উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমনকি রোহিঙ্গা পরিচয়ের ব্যক্তিরাও সরকারি ফ্ল্যাট পাওয়ার তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ নিয়ে এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা ইসমাইল, সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামালের সাবেক পিএস হিসেবে পরিচিত জিয়া এবং সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী সোবাহানকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। অভিযোগগুলো প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। ফলে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো যাচাই না করে, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীরা কীভাবে তাদের অধিকার ফিরে পাবেন?

এক পরিবারের পাঁচজনের নামে ফ্ল্যাট
নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত মো. ঈসমাইল হোসেনের পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের তথ্য।

স্থানীয়দের দাবি, ঈসমাইলের পরিবার একসময় টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করত। তাদের অভিযোগ, ২০০৮ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সপরিবারে কক্সবাজার শহরে এসে কুতুবদিয়াপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় আশ্রয় নেন ঈসমাইল। ওই সময় তার পরিবারের সঙ্গে সোনা আলী, মাবিয়া খাতুনসহ আরও কয়েকজন সদস্য ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ঈসমাইল রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের আরও সদস্য কক্সবাজারে এসে বসবাস শুরু করেন। একপর্যায়ে কুতুবদিয়াপাড়ায় জমি কিনে সেখানে বসবাস শুরু করেন তারা।

তবে ঈসমাইল ও তার পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈসমাইল নিজের বাবা-মায়ের পরিচয় পরিবর্তন করে স্থানীয় ব্যক্তিদের বাবা-মা হিসেবে দেখিয়ে ভোটার হয়েছেন। তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য কক্সবাজার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এনআইডি, ভোটার তালিকা, জন্মনিবন্ধন, স্থায়ী ঠিকানা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পুরোনো নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, কুতুবদিয়াপাড়ার ‘মুরগির ফার্ম’ এলাকায় ঈসমাইল বর্তমানে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নের সময় জেলা প্রশাসন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তার সম্পৃক্ততা ছিল বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়দের দাবি, উপকারভোগী নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঈসমাইল নিজের পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছেন।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈসমাইল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে—

ক্রমিক ৭১৬, এফপি-১৪৯ — মো. ইউনুস (ভাই)
ক্রমিক ১৩৯৯, এফপি-২৭২ — ফাতেমা আক্তার (বোন)
ক্রমিক ০৭, বিপি-৪৫০ — মাবিয়া খাতুন (মা)
ক্রমিক ১০২৯, এসকেপি-৯১ — জান্নাতুল বেকায়া (স্ত্রী)
ক্রমিক ৩২৫, বিপি-৪৫২ — মো. ঈসমাইল হোসেন (নিজ)

আলোচনায় রোহিঙ্গা জিয়াও
খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামালের সাবেক পিএস হিসেবে পরিচিত জিয়ার নামও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জিয়া রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে এনআইডি পাওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সরকারি নথি ও আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, জিয়ার এনআইডি কীভাবে হয়েছে, কে বা কারা তার নাগরিকত্বের পক্ষে সুপারিশ করেছেন এবং তার সম্পদের উৎস কী—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।

সোবাহানকে ঘিরেও আগের অভিযোগ
এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী সোবাহানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাদের অভিযোগ, ইসমাইল, জিয়া ও সোবাহানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় অনিয়মকারীরা আরও উৎসাহিত হয়েছেন।

স্থানীয়দের ক্ষোভ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. কায়সার বলেন, “রোহিঙ্গা ঈসমাইলসহ তার পরিবার আমাদের বাসায় ভাড়া থাকত, এটা সত্য। সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এনআইডি করা হলেও তাদের ব্যাপারে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।”

কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, “সম্প্রতি ৭৩০ পরিবারকে ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। সেখানেও অনেক রোহিঙ্গা ফ্ল্যাট পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মহল জানে যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এনআইডি করেছে। কিন্তু সেগুলো বাতিলের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। এনআইডি থাকলেই কেউ স্থায়ীভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে যায় না। নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাই-বাছাই করা দরকার।” তিনি আরও বলেন, “এসব বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছি।”

কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা সিরাজুল করিম ও শাহাব উদ্দিন বলেন, “ঈসমাইলের পরিবারের পাঁচজন যদি সরকারি ফ্ল্যাট পেয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয়দের জন্য কী থাকল? বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।”

তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তু ও স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য তালিকায় ঢুকেছে কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকতে পারেন।

তাদের দাবি, শুধু এনআইডি থাকার ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি উপকারভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার হওয়ার ইতিহাস, জন্মনিবন্ধন, স্থায়ী ঠিকানা, ভূমির মালিকানা, পূর্ববর্তী বসবাসের তথ্য এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নথি যাচাই করা হোক।

একই সঙ্গে আগের প্রতিবেদনে উত্থাপিত ইসমাইল, জিয়া ও সোবাহানকে ঘিরে অভিযোগগুলো পুনরায় তদন্ত করে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রভাব বিস্তার বা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।