বর্জ্যই যেখানে সম্পদ
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চালু হলো ‘ওয়েস্ট ক্যাফে’
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ‘বর্জ্যই যেখানে হয়ে উঠেছে সম্ভাবনা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সোমবার (২৯ জুন) উখিয়া উপজেলার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে ‘ওয়েস্ট ক্যাফে’। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশের গ্রিন এন্টারপ্রাইজ (জিই+) প্রকল্পের আওতায় ব্যতিক্রমধর্মী এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এই ক্যাফের মাধ্যমে ক্যাম্পের বাসিন্দারা ঘর ও আশপাশের প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জমা দিয়ে পয়েন্ট বা টোকেন অর্জন করবেন। সেই পয়েন্টের বিনিময়ে তারা প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের একটি কার্যকর মডেল গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
উদ্বোধন উপলক্ষে সকালে ক্যাম্পের বাসিন্দা, তরুণ স্বেচ্ছাসেবী এবং কেয়ার বাংলাদেশের কর্মীদের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র্যালিতে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বানসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। ক্যাম্পের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে র্যালিটি ওয়েস্ট ক্যাফে প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। পরে অতিথিরা ফিতা কেটে ক্যাফেটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ক্যাম্প-১৪ ও ক্যাম্প-১৫-এর ক্যাম্প ইন-চার্জ (সিনিয়র সহকারী সচিব) মো. মুনিবুর রহমান এবং কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাম দাস।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরআরসি), ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি), এনজিও প্ল্যাটফর্ম কক্সবাজার, অ্যাসোসিয়েশন ফর মাস অ্যাডভান্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (আমান), ইজিসেন্স, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গণমাধ্যমকর্মী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ওয়েস্ট ক্যাফে শুধু বর্জ্য সংগ্রহের স্থান নয়; এটি একটি সেবাকেন্দ্র ও সচেতনতা তৈরির হাব হিসেবেও কাজ করবে। এখানে বর্জ্য জমা দিয়ে প্রাপ্ত পয়েন্টের মাধ্যমে বাসিন্দারা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
ক্যাফেতে একটি ‘নলেজ কর্নার’ বা ক্ষুদ্র লাইব্রেরিও স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে শিশু, কিশোর ও তরুণরা বই পড়া, নতুন বিষয় শেখা এবং ক্যাফের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে একটি ওয়েবসাইট, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শুধু ক্যাম্পের বাসিন্দারাই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন না, আশপাশের ফসলি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই উদ্যোগ সফল করতে পুরো কমিউনিটির, বিশেষ করে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন।”
স্বাগত বক্তব্যে কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাম দাস বলেন, “এমন একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমি আনন্দিত। এটি সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে এটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিরা ওয়েস্ট ক্যাফের সেবা কাউন্টার, নলেজ কর্নার, দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তারা সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণা এবং কীভাবে দৈনন্দিন বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা যায় সে বিষয়ে অবহিত হন।
প্রধান অতিথির হাতে ‘ওয়েস্ট ক্যাফে’র লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। কেয়ার বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করেছে, এই উদ্যোগ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।