কক্সবাজার

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, আশ্রয়কেন্দ্রে নেই মানুষ

Copied
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, আশ্রয়কেন্দ্রে নেই মানুষ

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, আশ্রয়কেন্দ্রে নেই কোনো মানুষ। ছবি সংগৃহীত

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। বর্তমানে জেলার কোথাও কোনো পানিবন্দি পরিবার নেই বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার কিছু নিচু এলাকায় বন্যার সামান্য চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে।

টানা বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এবং পাহাড়ি ঢলের প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় জেলার প্রধান নদী মাতামুহুরী, নাফ ও বাঁকখালীর পানিও বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভার প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার মানুষ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ১৯ জন এবং আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন, যাদের মধ্যে ২০ জন স্থানীয় ও ৫ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া দুর্যোগের পর থেকে এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

সরকারি হিসাবে, বন্যায় ১০ হাজার ৫৪৬টি ঘরবাড়ি আংশিক এবং ৭৩২টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, কৃষি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর প্রাথমিক হিসাবে শুধু এই চার খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৪৫০ কোটি টাকারও বেশি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, বন্যায় জেলার প্রায় ২৯৪ কিলোমিটার সড়ক এবং ৫৫টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষি খাতে প্রাথমিকভাবে ৮০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় জেলার ৪৪টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর এবং ৪৫৩টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর।

বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে রয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভায় এ পর্যন্ত ৪৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা এবং ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থার দেওয়া ত্রাণও সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করা হয়। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কোনো মানুষ অবস্থান করছেন না। সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং 'ডি-ফরম' প্রস্তুতের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

বর্তমানে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা নগদ অর্থ, ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ১ হাজার ৭৭ বান্ডিল ডেউটিন, গৃহ নির্মাণে ৩০ লাখ টাকা, শিশুখাদ্যের জন্য ৪ লাখ টাকা, গো-খাদ্যের জন্য ১০ লাখ টাকা এবং ৫ হাজার ৮০০টি কম্বল মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জরুরি সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

এদিকে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় জেলা তথ্য অফিস উপদ্রুত এলাকায় মাইকিং এবং জরুরি জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনের আশা, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন।