কুতুপালংয়ে সড়ক দখল করে বাজার ও পার্কিং, ভোগান্তিতে মানুষ
কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা উখিয়ার ব্যস্ততম আরাকান সড়কের কুতুপালং অংশ এখন অবৈধ দোকানপাট ও যানবাহন পার্কিংয়ের দখলে। সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার, ঝুপড়ি দোকান ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।
এতে এক মিনিটের পথ পাড়ি দিতেও কখনো কখনো ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খলার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত শত শত যানবাহনের চালক, ভিআইপিদের বহনকারী গাড়ি, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ কার্যক্রম চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
কুতুপালং বাজারের অনিয়ম প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় সরকারি নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বাজার ইজারা নেওয়া এবং ইজারার মাধ্যমে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পেছনে হেলাল উদ্দিন মেম্বারের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে সর্বশেষ সরাসরি ২ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বাজারটি ইজারা নিয়েছেন বোরহান উদ্দিন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুতুপালং সড়কের উভয় পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে দোকানপাট। পাশাপাশি সড়কের ওপরই পার্ক করে রাখা হচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন। সড়কের পশ্চিম পাশেও গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঝুপড়ি দোকান। এতে বাজার এলাকায় প্রতিনিয়ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
শুধু কুতুপালং নয়, কোটবাজার, মরিচ্যা বাজার, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী বাজারের চিত্রও প্রায় একই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে একটি সিন্ডিকেট সড়ক দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং প্রতিটি গাড়ি পার্কিংয়ের বিপরীতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একাংশকে ম্যানেজ করে সড়ক দখল ও অবৈধ বাজারের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, প্রকাশ্যে এসব অবৈধ দখল চললেও ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মিত এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করলেও সরকারি গাড়িতে চলাচলের কারণে তাঁরা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উপলব্ধি করতে পারছেন না।
কুতুপালং এলাকার আমিন নামের এক পথচারী বলেন, ‘বাজারে একটু যেতে হলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। জরুরি রোগী নিয়েও অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের এক পাশে সিএনজি, অন্য পাশে ঝুপড়ি দোকান—সব মিলিয়ে সড়কের অবস্থা একেবারে নাজুক।’
সড়কের ওপর অবৈধভাবে জাম্বুরা বিক্রি করা সৈয়দুর রহমান বলেন, ‘বাজারে জায়গা দিতে না পেরে আমাকে এখানে বসানো হয়েছে। আমি ২৫০ টাকা হাসিল (টোল) দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই।’
কুতুপালং উচ্চবিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন যানজটের কারণে তাদের স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে যেখানে পাঁচ মিনিট লাগার কথা, সেখানে যানজটের কথা চিন্তা করে এক ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। বিশেষ করে সকালে সড়কে যানবাহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।
কুতুপালং বাজার এলাকার জাবেদ নামের এক চাকরিজীবী বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। কুতুপালং বাজারের যানজটে অফিসে পৌঁছাতে অনেক সময় নষ্ট হয়। বাজারের সড়ক এখন ব্যবসায়ী ও পার্কিংয়ের দখলে চলে যাওয়ায় আমাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।’
কোটবাজারে সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনাকারী এক দোকানদার বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এখানে দোকান করি। শখ করে তো আর সড়ক দখল করিনি। টাকার বিনিময়ে এখানে বাজার বসানো হয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে এক ভাই সংগ্রহ করেন। টাকা দিয়েই আমরা এখানে নিরাপদে ব্যবসা করছি।’
গাড়ি পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা এক লাইনম্যান জানান, পার্কিংয়ের জন্য তাঁদের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। কারা এই টাকা নেন, তা তাঁরা জানেন না। তাঁরা শুধু ওপরের নির্দেশ পালন করেন। টাকা না দিলে সেখানে গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া হয় না। তাঁর ভাষ্য, পার্কিং বন্ধ করতে হলে আগে বিকল্প ও নিরাপদ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেল বলেন, ‘আমরা চাই, অবৈধ দোকানগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করা হোক। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন সকাল-বিকেল যানজট লেগে থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এ সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হলে বাজার ইজারাদারকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্যথায় যানজট চলতেই থাকবে।’
শাহপরী হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই ফজলুল হক জানান, কুতুপালং বাজারের যানজট নিরসনে বাজার সমিতি, ইজারাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতায় শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোটবাজারের যানজট নিরসনেও ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমন্বয় ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করব। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সড়ক দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ ঝুপড়ি দোকান ও পার্কিং উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে কাজ চলছে। যারা কুতুপালং সড়ক দখল করে বাজার বসিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী, ইজারা দেওয়ার শুরুতেই বাজারের মূল্যতালিকা প্রকাশ ও টাঙানোর কথা। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা করা হয়নি। আমি যোগদানের পরপরই বাজারের মূল্যতালিকা তৈরি করে অনুমোদনের জন্য কক্সবাজারে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে শিগগিরই তা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দেওয়া হবে।’