পরিবেশ ও প্রকৃতি

জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা, কৃষকের সংকট ও পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

Copied
জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা, কৃষকের সংকট ও পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

এম. আবদুল মান্নান, উন্নয়ন কর্মী, সমাজ সংস্কৃতি ও অধিকার কর্মী। ছবি সংগৃহীত

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার আবারও প্রমাণ করল যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলাকে একযোগে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের মুখোমুখি করেছে।

বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, জাতীয় গণমাধ্যম এবং মানবিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জেলার বহু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে, হাজারো পরিবার পানিবন্দী হয়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবানিয়ারছড়া, ঝিলংজা, খুরুশকুল, ইসলামপুর, পিএমখালী, ভারুয়াখালীসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল। পাহাড়ি ঢল ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে নগর জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করে। পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি পারিবারিক সবজি বাগান, ক্ষুদ্র কৃষি খামার ও নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

রামু উপজেলায় বাঁকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, জোয়ারিয়ানালা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, গর্জনিয়া, ঈদগড়সহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মৌসুমি সবজি, ধান, বীজতলা, গবাদিপশুর খাদ্য এবং কৃষি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পেরে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি আরও বেড়েছে।

উখিয়া উপজেলায় রাজাপালং, রত্নাপালং, জালিয়াপালং, কুতুপালং ও বালুখালী এলাকার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটির কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও দিনমজুর পরিবারও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশন সমস্যা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষের জন্য ভূমিধস একটি বড় মানবিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলায় হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সাবরাং, বাহারছড়া এবং উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মাছের ঘের, কৃষিজমি, শুঁটকি উৎপাদন এলাকা এবং লবণচাষ ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং উপকূলীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে।

এই চারটি উপজেলাই FAO-এর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত PRO-ACT Bangladesh প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কর্ম এলাকা। প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নিরাপদ সবজি উৎপাদন, কৃষক সংগঠন, অ্যাগ্রিগেশন সেন্টার, বাজারসংযোগ, মৎস্য উন্নয়ন, শুঁটকি মূল্যশৃঙ্খল, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং হোস্ট কমিউনিটির জীবিকা উন্নয়নে কাজ চলছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় প্রকল্পভুক্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী কৃষক, কৃষক সংগঠন, মৎস্যচাষি, শুঁটকি উৎপাদক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ও আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

এই দুর্যোগ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে—শুধু ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। জরুরি কৃষি পুনর্বাসন, মানসম্মত বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, মৎস্য খাত পুনরুদ্ধার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেচব্যবস্থার দ্রুত সংস্কার, পাহাড় সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনঃখনন এবং বৈজ্ঞানিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে সরকার, FAO, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।

কক্সবাজারের এই দুর্যোগ কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভিযোজন সক্ষমতারও একটি কঠিন পরীক্ষা। আজকের কার্যকর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই নির্ধারণ করবে—প্রান্তিক কৃষক ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠী আগামী দিনের দুর্যোগ মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হয়ে উঠবে।

লেখক - একজন উন্নয়ন কর্মী, সমাজ সংস্কৃতি ও অধিকার কর্মী।