অর্থনীতি

ডিসিসিআই সেমিনারে অর্থনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের পরামর্শ

জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে বিনিয়োগে স্থবিরতা, গতি ফেরানো জরুরি

Copied
জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে বিনিয়োগে স্থবিরতা, গতি ফেরানো জরুরি

ছবি সংগৃহীত

জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদ হার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতির কারণে ও বিনিয়োগ স্থবিরতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যাবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত, নীতিগত সংস্কার এবং রাজস্ব আদায়ের নামে হয়রানি বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব সমস্যা রাতারাতি নিরসন করা সম্ভব নয়, তবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে থাকা সব ধরনের বাধা দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের ষাণ্মাসিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার এবং সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।


ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের আলোচনার প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনে সরকার অটল থাকবে। তবে বিএনপি সব সময় বিধ্বস্ত অর্থনীতির সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসে। এর ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। তবু সরকার টেকসই অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বিনিয়োগে বাধা নিরসনে অর্থমন্ত্রী জানান, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। ব্যাবসা সহজ করতে সরকার ডিরেগুলেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বিশেষ কমিটি ও ওয়েবসাইট চালু করা হচ্ছে, যেখানে ব্যবসায়ীরা সরাসরি সমস্যার কথা জানাতে পারবেন। কাস্টমস ও বন্দরে পণ্য খালাসের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়ে ব্যাবসা করার খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জ্বালানি খাতের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় বলে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোচ্ছে। বর্তমানে এক মাসের জ্বালানি রিজার্ভ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং এটিকে তিন মাসে উন্নীত করা হবে। গ্যাসের সংকট মেটাতে একাধিক এফএসআরইউ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং নিজস্ব গ্যাস রিজার্ভ বাড়ানোর কাজও শুরু হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও এসএমই প্যাকেজ, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা নিয়োগ দেওয়া হবে না বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি নয় কিন্তু পরিস্থিতির শিকার, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ প্যাকেজ ও সহজ এক্সিট পলিসি ঘোষণা করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিকল্প অর্থায়ন ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকার এখন শুধু আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থায়নের দিকে নজর দিচ্ছে। হংকং-এ বাংলাদেশের জন্য একটি ডেডিকেটেড দুই বিলিয়ন ডলারের ফান্ড এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পান্ডা বন্ড ও স্যামুরাই বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতিরোধ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকারি সব সেবায় টোটাল অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময় বেধে দেওয়া হয়েছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মাত্র ৫ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেসরকারি ঋণের এমন ধীরগতি বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগের বিষয়। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত, রপ্তানির লিডটাইম কমানো এবং ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।

তাসকীন আহমেদ বলেন, সিএমএসএমই খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশের বিপরীতে মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যাবসার খরচ বাড়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত জামানতভিত্তিক ঋণের বাইরে ডিজিটাল স্কোরিংয়ের মাধ্যমে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানি একটি নেতিবাচক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ফলে সংস্কার উদ্যোগের সুফল মিলছে না। করজাল সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর করতে এ হয়রানি কমানোর পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকিতে ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দেন।

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নামেনি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। উচ্চ সুদ, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ব্যাবসার খরচ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের আস্থা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ফারাক থাকায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানি পর্যায়ে উচ্চ শুল্কহার স্থানীয়ভাবে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরি।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বিল্পব ঘটাতে হবে এবং বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভব খুবই কম। তিনি বলেন, বাজেটের ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে সেটার প্রতিফলন নেই, ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরি। এছাড়াও জনগণ যে পরিমাণ কর দিচ্ছেন, সেটাও কোষাগারে জমা হচ্ছে না, বিষয়টি বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়াও বিদেশি ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উচ্চ সুদের হার, খেলাপি ঋণ, সরকারের ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়া, জ্বালানি সংকট ও দুর্বল লজিস্টিক ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের গতি না ফেরার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের মতে, শুধু সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না; জ্বালানি ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাবসা পরিচালনার অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।