“পাচায় ঘা, মাথায় মলম”: রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত সমাধান কোথায়?
একটি সংকটের প্রকৃত সমাধান যেখানে নিহিত, সেখানে আঘাত না করে অন্য কোথাও বাহ্যিক প্রলেপ দেওয়ার নীতিকে বাংলায় রূপক অর্থে বলা হয়—‘পাচায় ঘা, মাথায় মলম’। বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট হলো রোহিঙ্গা সমস্যা।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এই সংকটের মূল ক্ষত নিহিত রয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব আইন এবং দেশটির সরকারের অনীহার মধ্যে। ফলে এর স্থায়ী সমাধানও সম্ভব কেবল মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি, জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা এবং এনজিও প্রতিনিধিরা নিয়মিত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন। এসব পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ প্রকাশের ধারাবাহিকতা সংকটের মূল কারণকে স্পর্শই করতে পারছে না। বরং এটি যেন সেই ‘মাথায় মলম’ লাগানোর মতোই এক প্রতীকী ও অকার্যকর উদ্যোগ। এ প্রক্রিয়ায় দিন শেষে লাভবান হচ্ছে মূলত বিদেশি তহবিলনির্ভর বিভিন্ন সংস্থা, আর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির ভার বহন করছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও সার্বভৌমত্ব।
যেকোনো রোগের চিকিৎসার প্রথম শর্ত হলো সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ক্ষতস্থানে সরাসরি ওষুধ প্রয়োগ। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও ‘ক্ষত’ হলো মিয়ানমার। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা এবং তাদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করেছে সে দেশের সামরিক জান্তা। অতএব, এ সমস্যার সমাধানও করতে হবে মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে, কার্যকর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, সমস্যাটি যেন বাংলাদেশের সৃষ্টি। জাতিসংঘের মহাসচিব, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রতি বছর কক্সবাজারের ক্যাম্পে আসেন। তাঁরা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা শোনেন, ছবি তোলেন, উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ফিরে যান। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের যে কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তা মূল সংকটের সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
মাথায় মলম লাগালে যেমন ক্ষত সারে না, তেমনি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের এসব প্রতীকী ক্যাম্প পরিদর্শনও মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। মূল সমস্যা—অর্থাৎ মিয়ানমারের অনীহা—উপেক্ষা করে কেবল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি বা ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বর্তমান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অনুপস্থিতি ও স্থবিরতা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দৃঢ়, বাস্তবসম্মত এবং ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। এ প্রক্রিয়ায় চীন, ভারত কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কয়েক দফা প্রত্যাবাসন চুক্তিতে সই করলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি।
বাংলাদেশ সরকার যখনই আন্তর্জাতিক মহলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়েছে, তখনই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি দুর্বল হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়া বা নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হওয়া তুলনামূলক সহজ; কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে কার্যকর আলোচনার টেবিলে এনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করা অনেক বেশি কঠিন।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আনুষ্ঠানিক সফরের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি মিয়ানমার এবং দেশটির প্রধান সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর—বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার—সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক দরকষাকষি জোরদার না করে, তাহলে এ সংকটের রাজনৈতিক সমাধান অধরাই থেকে যাবে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এই স্থবিরতাই প্রমাণ করে, আমরা সমস্যার মূল কারণের পরিবর্তে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েই বেশি ব্যস্ত।
লেখক : মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন, পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।