অপরাধ

নাগরিকত্ব ও সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি

ফ্ল্যাট বরাদ্দ ঘিরে জিয়াকে নিয়ে নতুন অভিযোগ

ফ্ল্যাট বরাদ্দ ঘিরে জিয়াকে নিয়ে নতুন অভিযোগ

ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজারের খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে জিয়াউর রহমানের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামালের সাবেক পিএস হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমান রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ফ্ল্যাট পাইয়ে দেওয়ার নামে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। পরে ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও দাবি তাদের।

তবে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে অর্থ লেনদেন, কথিত অর্থ উপার্জন কিংবা বাড়ি নির্মাণে সেই অর্থ ব্যবহারের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এনআইডি নিয়ে আগেও অভিযোগ
জিয়াউর রহমানকে ঘিরে বর্তমান অভিযোগের পাশাপাশি অতীতেও তার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হিসেবে জিয়াউর রহমান ভিন্ন পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, প্রথমে স্থানীয় করিম দাদ ও আনোয়ারা বেগমকে পিতা-মাতা পরিচয় দিয়ে তিনি একটি এনআইডি সংগ্রহ করেন।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই এনআইডিতে তার নাম ছিল মো. জিয়াউর রহমান। ভোটার নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল ২২১২৬৬০০১৩৫৪। পিতার নাম ছিল করিম দাদ এবং মাতার নাম আনোয়ারা বেগম।

পরবর্তী সময়ে সংশোধিত এনআইডিতে পিতা-মাতার নাম পরিবর্তন করে মনির আহমদ ও ফরিদা বেগম করা হয় বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। একই ভোটার নম্বর রেখে জন্মতারিখেও পরিবর্তনের তথ্য উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের দুই বোন কহিনুর আকতার ও শাহিনুর আকতারকেও একই পারিবারিক পরিচয়ে বাংলাদেশি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ওই প্রতিবেদনে তোলা হয়েছিল। এ ঘটনায় কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানানো হয়েছিল।

এনআইডি তৈরির পেছনে কার সুপারিশ?
পুরোনো অভিযোগ এবং নতুন করে ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগ সামনে আসায় জিয়াউর রহমানের এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তার নাগরিকত্বের পক্ষে কারা সুপারিশ করেছিলেন, কোন নথির ভিত্তিতে তাকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং এনআইডি তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে তার পরিচয় যাচাই করেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে এনআইডিতে পিতা-মাতার পরিচয় ও জন্মতারিখ পরিবর্তনের বিষয়টি সত্য হলে সংশোধনের সময় কী কী নথি জমা দেওয়া হয়েছিল, কে বা কারা প্রত্যয়ন করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কীভাবে তা অনুমোদন করেছিলেন—সেসব নথিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এনআইডি তৈরির মূল আবেদন, সংযুক্ত কাগজপত্র, নাগরিকত্বের সনদ, সুপারিশ এবং পরবর্তী সংশোধনের রেকর্ড যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

খুরুশকুলের ফ্ল্যাট বরাদ্দে তার ভূমিকা কী?
খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। জিয়াউর রহমান নিজে কোনো ফ্ল্যাটের বরাদ্দ পেয়েছেন কি না, পেয়ে থাকলে কোন শ্রেণি বা কোটায় পেয়েছেন, তার নামে আবেদন কে করেছেন, যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ কী ছিল এবং বরাদ্দের আগে তার নাগরিকত্ব ও পারিবারিক পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে থাকার কথা।

অন্যদিকে, তিনি যদি অন্য কোনো ব্যক্তির ফ্ল্যাট বরাদ্দে মধ্যস্থতা বা প্রভাব বিস্তার করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীদের আবেদনপত্র, বরাদ্দের তালিকা, যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
জিয়াউর রহমানের বর্তমান সম্পদ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, ফ্ল্যাট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কথিত আর্থিক লেনদেনের পর তিনি এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ফলে বাড়ি নির্মাণে অর্থের উৎস কী ছিল এবং তার ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে ওই সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

আগের অভিযোগের পর ব্যবস্থা কী?
জিয়াউর রহমানের এনআইডি নিয়ে আগে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে কোনো তদন্ত করেছে কি না—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী? এনআইডি তৈরিতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আর তদন্ত না হয়ে থাকলে তার কারণই বা কী—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

একইভাবে, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কোনো সম্পৃক্ততা থাকলে বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় তার নাগরিকত্ব ও পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নাগরিকত্ব, এনআইডি, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ এবং সম্পদের উৎস নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় অভিযোগ হিসেবে রেখে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা জরুরি।

তাই জিয়াউর রহমানের এনআইডি প্রাপ্তির প্রক্রিয়া, নাগরিকত্বের নথি, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দে তার ভূমিকা এবং বর্তমান সম্পদের উৎস—পুরো বিষয়টি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এসব অভিযোগের বিষয়ে জিয়াউর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।