রাজনীতি

বিএনপির মহাসচিব হতে যাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী

Copied
বিএনপির মহাসচিব হতে যাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে যারা রাজপথে অটল থেকেছেন এবং দলের দুর্দিনে নেতৃত্বের হাল ধরেছেন এবং বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও মূল্যায়ন করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমনটাই জানা গেছে দলটির বিশ্বস্ত সূত্রে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মনোনীত করেছে বিএনপি। সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থিত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনীত প্রার্থীই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, এটি নিশ্চিত।

দলটির গঠনতন্ত্র মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে বৈধ প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হচ্ছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সফলতার সঙ্গে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।

একইসঙ্গে দলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং সাহসী মুখ হিসেবে রুহুল কবির রিজভীই হাইকমান্ডের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন। রিজভীই হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, রিজভী আহমেদ দলের দুঃসময়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করেছেন। তার এই ত্যাগ ও নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে এই বড় দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে পরবর্তী সময়ে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমেই মহাসচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, রুহুল কবির রিজভী বিএনপির রাজনীতিতে একজন আপসহীন নেতা হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে গত দেড় দশকে দলের কঠিন সময়ে তিনি নয়াপল্টন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে দলের কার্যক্রম চাঙ্গা রেখেছেন।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের রোষানলের শিকার হয়ে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব পালন এবং নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে দেশ-বিদেশের মিডিয়ার মাধ্যমে দলটির কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের জাগ্রত রেখেছেন। ফলে, দলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তার একটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

সাম্প্রতি রুহুল কবির রিজভীর অদম্য সাহসিকতা ও দলের প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্যের কথা উঠে দলের শীর্ষ ফোরামের বৈঠকে। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে বৈঠকে আলোচনাকালে শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, নয়াপল্টন কার্যালয়ে দিনের পর দিন অবস্থান করে রিজভী যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। দমন-পীড়নের মুখেও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের কণ্ঠস্বর সচল রাখা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য রিজভীকে তিনি ‘সংগ্রামের প্রতীক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পদ-পদবির চেয়ে দলের প্রতি আনুগত্য এবং জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকাই প্রকৃত নেতার কাজ, যেটি করেছেন রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই নেতার অবদানকে শীর্ষ পর্যায় থেকে স্বীকৃতি দেওয়াকে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও কৃতজ্ঞতাবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

কর্মীদের মতে, রিজভী আহমেদ হলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক, যাকে দলের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে পাওয়া যায়। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সুপরিচিত ও কর্মীবান্ধব নেতা রুহুল কবির রিজভী। এমনকি রাজধানী থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নেতাকর্মীদের কাছে রাজধানীর নয়াপল্টস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিস মানেই রুহুল কবির রিজভী।

দলের সূত্রের মতে, জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দায়িত্ব পাওয়ার ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। এখনো আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। দলের ভেতর থেকেও আমাকে কিছু বলা হয়নি।

রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত বিবরণ: রাজনীতিতে হার না মানা এক আপসহীন যোদ্ধার নাম রুহুল কবির রিজভী। এরশাদবিরোধী ছাত্র-শ্রমিক আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ-বিডিআরের ছোড়া থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি যার পেট দিয়ে ঢুকে পিঠ ভেদ করে চলে গেছে। যে ক্ষত তিনি আমৃত্যু বয়ে চলছেন কিন্তু এতটুকু দমে যাননি কখনো। বিএনপির ক্রান্তিকালে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের চরম দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তারের মাঝেও তিনি রাজপথে নিজেকে মেলে ধরেছেন অনন্য মহিমায়। রাজনীতির মাঠে কখনো পাওয়া না পাওয়ার হিসাব রিজভী ভাইকে দমাতে পারেনি।

রাজনীতিতে ‘কমিটমেন্ট’ শব্দটা ভাইয়ের হৃদয়ে বড়ই প্রকট, যে কারণে আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি হরতাল বা অবরোধের ঘোষণা দিয়ে সীমাবদ্ধতার ভেতরেও (তখন অনেক নেতাই ফোন বন্ধ রাখতো) ঘরে না বসে থেকে যতটুকু পেরেছেন লোক বল নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। প্রায় প্রতিদিন মিছিল করে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রেখেছেন। শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে কারাভোগ করেছেন ৯ বার। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কারাভোগ করেছেন ৭ বার।

আপসহীন দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া যতদিন কারান্তরীণ ছিলেন, রিজভী ভাই ঘোষণা দিয়েছিলেন পার্টি অফিসকে আগলে রাখবেন, তিনি তার কথা থেকে বিচ্যুত হননি। ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০ এই সালগুলোতে পার্টি অফিসের সামনে কেউ গেলেই ডিবি পুলিশ তাদেরকে তুলে নিত, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ প্রয়োজন ছাড়া অফিসের দিকে আসতেন কম। কিন্তু সারা দেশের তৃণমূলের নেতাকর্মী পার্টি অফিসে এসে সব সময় রুহুল কবির রিজভীকে পেয়েছেন।

১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে দল যখন সংস্কারপন্থিদের খপ্পরে পরে সে সময়ও তিনি দলের হাল ধরেন। এক কথায় বলা যায়, বিএনপির রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম রুহুল কবির রিজভী।