মতামত | বিশ্লেষণ

সীমান্তের নীল বিপ্লব: উখিয়ার ২,৫০০ একর চিংড়ি ঘের ও সম্ভাবনার দুয়ার

Copied
সীমান্তের নীল বিপ্লব: উখিয়ার ২,৫০০ একর চিংড়ি ঘের ও সম্ভাবনার দুয়ার

মুহাম্মদ ফায়েজ, রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ। ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার সীমান্তসংলগ্ন পালংখালী ইউনিয়নের নাফ নদীঘেঁষা এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ২,৫০০ একর বা ১০.১২ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত চিংড়ি ঘের। স্থানীয় বহু মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এই বিশাল জলাভূমি বছরের পর বছর ধরে মূলত সনাতনী পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের আওতায় রয়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে এই বিশাল জলসম্পদের উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।

অথচ পরিকল্পিতভাবে আধুনিক ও আধা-নিবিড় পদ্ধতি চালু করা গেলে উখিয়ার এই চিংড়ি অঞ্চল স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রিত মজুত ঘনত্ব, মানসম্মত পোনা, সুষম খাদ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে আধা-নিবিড় চিংড়ি চাষ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা গেছে; সাম্প্রতিক একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায় উন্নত ব্যবস্থাপনার আওতায় পাইলট ঘেরে প্রতি একরে ২,২৪০ কেজি পর্যন্ত ফলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুধু প্রযুক্তি প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিরাপত্তা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং স্থিতিশীল মালিকানা ও ইজারা কাঠামো। স্থানীয় চাষিদের একটি বড় অংশের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো—যেমন সোলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, এয়ারেটর, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং উন্নত ঘের ব্যবস্থাপনা—স্থাপনে বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ কমতে পারে।

সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে ঘেরের মালিকানা, ইজারা, দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ ও অনিশ্চয়তার কথা শোনা যায়। এসব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও নথিপত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আরোপ করা সমীচীন নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঘের ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে আধুনিকায়নের উদ্যোগ টেকসই হওয়া কঠিন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে দল-মত নির্বিশেষে স্থানীয় চাষি, জমির মালিক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে সমবায়ভিত্তিক বা ‘কমিউনিটি ক্লাস্টার ফার্মিং’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে ছোট ছোট ঘেরকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পানি ব্যবস্থাপনা, পোনা সংগ্রহ, খাদ্য সরবরাহ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও এয়ারেশন এবং উৎপাদিত চিংড়ির বিপণন—সবকিছু যৌথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় উৎপাদন ও মুনাফা বাড়লে তার সুফল শুধু ঘেরের মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অংশীদারত্ব বা লভ্যাংশের মাধ্যমে স্থানীয় চাষি, শ্রমিক ও জমির মালিকদের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে। এতে চিংড়ি ঘেরগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যৌথ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

তবে আধা-নিবিড় চাষ মানেই শুধু বেশি পোনা বা বেশি খাদ্য ব্যবহার নয়। এর সঙ্গে পানি ও মাটির গুণমান নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি, পর্যাপ্ত এয়ারেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নিবিড়তা ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে রোগ ও পানির গুণগত অবনতি উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই রূপান্তর সফল করতে সরকারের নীতিগত সহায়তাও জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ ইজারা ব্যবস্থা, বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা, প্রশিক্ষণ, মানসম্মত পোনা ও খাদ্যের নিশ্চয়তা এবং রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য কারিগরি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ৫ থেকে ১০ বছরের স্থিতিশীল ইজারা বা ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকলে উদ্যোক্তারা আধুনিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হতে পারেন।

উখিয়ার এই প্রায় ২,৫০০ একর সীমান্তবর্তী চিংড়ি অঞ্চল তাই শুধু নাফ নদীর তীরবর্তী কিছু জলাভূমি নয়; সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এটি কক্সবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। বাংলাদেশের উপকূলীয় চিংড়ি খাতে সনাতনী ও উন্নত পদ্ধতির উৎপাদন ব্যবধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা হয়েছে এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগের কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

ক্ষমতা ও প্রভাবের দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে যদি স্বচ্ছ মালিকানা ও ইজারা ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং জনগণের যৌথ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা যায়, তাহলে উখিয়ার এই ঘেরগুলোই হয়ে উঠতে পারে প্রান্তিক চাষিদের আয় বৃদ্ধির শক্তিশালী মাধ্যম। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়লে দেশের চিংড়ি রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও এর ইতিবাচক অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে উখিয়ার সীমান্তের এই জলভূমিই হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের একটি ‘নীল অর্থনীতির’ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

মুহাম্মদ ফায়েজ.......

রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ।