অসহিষ্ণুতার শহর ও গ্যাং সংস্কৃতি: কোথায় যাচ্ছে তরুণ সমাজ?
এই যে কথায় কথায় কাচের বোতল ভেঙে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া, দা-কিরিচ দিয়ে কোপানো, শরীরের বিভিন্ন অংশে অনবরত ছুরি চালানো কিংবা লোহার রড দিয়ে আঘাত করা—এসব যেন এখন আমাদের সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
যৎসামান্য, কখনো কখনো একেবারেই তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে মৌখিক ঝগড়া শুরু হয়। আর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেটি রূপ নেয় ভয়াবহ সংঘর্ষে। ৫০ থেকে ৭০ জনের দুটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি হয়। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর আর রক্তারক্তি সংঘর্ষ। মনে হয়, এ যেন কোনো নতুন ঘটনা নয়; বরং হাজার বছরের পুরোনো কোনো ঐতিহ্য!
পাড়ায় পাড়ায় এখন অনূর্ধ্ব ত্রিশ বছর বয়সী তরুণদের বিশাল বিশাল গ্যাং। একটি ফোন কল আসবে, আর সঙ্গে সঙ্গেই দমকল বাহিনীর মতো বাইকের শোডাউন দিয়ে সাঁ সাঁ করে ঘটনাস্থলে হাজির হবে দুই পক্ষের বন্ধুবান্ধব ও গ্যাং সদস্যরা। সঙ্গে থাকবে নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্রপাতি। এরপর শুরু হবে সংঘর্ষ, খুনাখুনি আর দৌড়াদৌড়ি।
সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য বিঘ্নিত হবে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয়ে উঠবে বিষাদময়। অথচ এসব নিয়ে যেন কারও মাথাব্যথা নেই। নরক রাজ্যের রাজাদের মতো তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আর এ দৃশ্য এখন যেন এ শহরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
ইয়াবা, মাদক, নেশা, মদ, নারী এবং টিকটককেন্দ্রিক তথাকথিত হিরোইজম—সব মিলিয়ে এই প্রজন্মের একটি অংশ কতটা অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে, তা হয়তো তাদের পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা অভিভাবকরাও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা না করে বড়রা নিজের এলাকার সন্তানদের ‘হেডামের চ্যাম্পিয়ন’ বানাতে ব্যস্ত থাকেন। সামান্য তর্কাতর্কি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে মুহূর্তেই এলাকার সম্মান ও আধিপত্যের প্রশ্নে পরিণত করা হয়। তারপর সেই ছোট্ট ঘটনাই রূপ নেয় বড় সংঘর্ষে।
আমরা কি একবারও ভেবে দেখছি—কোন সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
সহনশীলতা কমছে, মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। সামান্য মতবিরোধও এখন সহ্য করার ক্ষমতা নেই। যুক্তির জায়গায় অস্ত্র, আলোচনার জায়গায় হামলা আর সমাধানের জায়গায় প্রতিশোধ জায়গা করে নিচ্ছে।
কি অসহিষ্ণু, কি বর্বর এক সময় পার করছি আমরা!
প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়? আর আমরা কি সত্যিই এই প্রজন্মকে একটি সহনশীল, মানবিক ও নিরাপদ সমাজ উপহার দিতে পারব?