কক্সবাজারের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত জরুরি
কক্সবাজারের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম সময়ের কণ্ঠস্বর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্যের বরাত দিয়ে ‘লাইন’ ও ‘কোম্পানি খরচ’-এর নামে অর্থ আদায়ের দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত ত্রুটি থাকা কিছু যানবাহন নিয়মিত সড়কে চলাচল করছে। এসব যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে কথিত অর্থ লেনদেনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি পরিবহন খাত থেকে ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসিক বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের দাবিও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের টিআই (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজের নাম উল্লেখ করে কিছু অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ আদায়ের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ঘিরে একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার দাবি রয়েছে। এসব পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের তথ্য ও অভিযোগের সত্যতা কী ছিল, সে বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ একই ধরনের অভিযোগ একাধিকবার প্রকাশ্যে এলে সেটিকে কেবল সংবাদ হিসেবে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে অভিযোগগুলোর ভিত্তি যাচাই করা জনস্বার্থের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে-কক্সবাজারের সড়কে যদি সত্যিই ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন নিয়মিত চলাচল করে থাকে, তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের চিত্র কী? নিয়মিত অভিযান ও তদারকি হয়ে থাকলে এসব যানবাহন কীভাবে সড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে?
একইভাবে ‘লাইন’ বা ‘কোম্পানি খরচ’-এর নামে অর্থ আদায়ের কোনো বাস্তব ব্যবস্থা আছে কি না, থাকলে এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং অর্থের হিসাব কী-এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
তবে এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান বা অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন নথি, পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান।
এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের অভিযান ও মামলার তথ্য, বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস সংক্রান্ত নথি, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বক্তব্য এবং অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ থাকলে তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আবার তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে, অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও কমবে।
কক্সবাজার শুধু একটি জেলা শহর নয়; দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। এখানকার সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের বৈধতা এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা সরাসরি জননিরাপত্তা ও পর্যটন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো গুরুতর অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
আমরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে দায়ী করতে চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের সামনে ওঠা প্রশ্নগুলোরও একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর থাকা দরকার।
অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা কোথায়? আর অভিযোগ সত্য না হলে তদন্তের ফল কোথায়? এই দুই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকাশিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া। তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে এলে প্রকৃত তথ্য পরিষ্কার হবে। এতে অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ পাবেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি কক্সবাজারের সড়কে আইন, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও সমানভাবে আইন প্রয়োগের। এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।