পরিবেশ ও প্রকৃতি

তামাক নয়, খাদ্য ও জীবনের পক্ষে দাঁড়াক কক্সবাজার

খাদ্যশস্যের জমিতে মৃত্যুশস্য: তামাকের আগ্রাসন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শঙ্কা

Copied
খাদ্যশস্যের জমিতে মৃত্যুশস্য: তামাকের আগ্রাসন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শঙ্কা

লেখক: এম. আবদুল মান্নান, উপকূল, পরিবেশ, কৃষি ও জীবন-জীবিকা পর্যবেক্ষক। ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজার শুধু বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশসমৃদ্ধ অঞ্চল। উর্বর কৃষিজমি, পাহাড়, বনভূমি ও নদীনির্ভর এই জনপদ দেশের খাদ্য উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তামাক চাষের বিস্তার কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপদের রূপ নিয়েছে।

রামু, চকরিয়া, ঈদগাঁও, উখিয়া ও টেকনাফসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদী অববাহিকার উর্বর জমিতে তামাকের আবাদ দ্রুত বাড়ছে। যে জমিতে একসময় ধান, ডাল, তিল, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদিত হতো, তার একটি বড় অংশ এখন তামাকের দখলে চলে যাচ্ছে।

তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের অগ্রিম অর্থ, বীজ, সার, কীটনাশক ও উৎপাদিত পাতা কেনার নিশ্চয়তা দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চাষে উৎসাহিত করে। স্বল্পমেয়াদি নগদ আয়ের আশায় অনেক কৃষক এই চাষে যুক্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হচ্ছে মাটি, পরিবেশ, কৃষক পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বহুদিন ধরেই তামাককে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে প্রাণ হারায়। তবে তামাকের ক্ষতি শুধু ভোক্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর উৎপাদন প্রক্রিয়াও কৃষক, শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক একটি উচ্চমাত্রার পুষ্টি শোষণকারী ফসল। এটি মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম শোষণ করে, ফলে জমির জৈব উর্বরতা দ্রুত কমে যায়। পরবর্তী মৌসুমে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

তামাক চাষে ব্যাপক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি, নদী ও খাল দূষিত হয়। এতে জলজ প্রাণী, মাছের প্রজনন এবং সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জেলা হিসেবে কক্সবাজারের জন্য এটি আরও উদ্বেগজনক।

আরেকটি বড় ক্ষতি হলো বন উজাড়। তামাক পাতা শুকাতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হওয়ায় বনভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমিক্ষয় এবং জলবায়ু ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে তামাক গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজমি দখল করে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করে এবং মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। ২০২৩ সালে WHO ও FAO যৌথভাবে "Grow Food, Not Tobacco" কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রতি উৎসাহিত করার আহ্বান জানায়। তাদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তাহীন বিশ্বে উর্বর জমিতে তামাক চাষ টেকসই উন্নয়নের পরিপন্থী।

বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিকল্প ফসল চাষ, উন্নত বীজ, কৃষি প্রণোদনা ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কৃষকদের জন্য সবজি, ফল, মাছ চাষ, সমন্বিত খামার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করছে।

কক্সবাজারের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় ড্রাগন ফল, মাল্টা, লেবু, আম, পেঁপে, আদা, হলুদ, মরিচ, চিনাবাদাম, তিল, সূর্যমুখী, ভুট্টা এবং উচ্চমূল্যের সবজি চাষ তামাকের তুলনায় অধিক লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব হতে পারে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের টেকসই আয়ের পথ তৈরি করা সম্ভব।

আজকের তামাক চাষ আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। কৃষিজমির মূল উদ্দেশ্য মানুষের খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা—মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় এমন ফসল উৎপাদন নয়।

অতএব, কক্সবাজারের উর্বর কৃষিজমি, বনভূমি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষকদের লাভজনক বিকল্প আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে তামাক চাষ হ্রাসের কার্যকর রোডম্যাপ বাস্তবায়নই পারে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

লেখক: এম. আবদুল মান্নান
উপকূল, পরিবেশ, কৃষি ও জীবন-জীবিকা পর্যবেক্ষক