কক্সবাজার

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু; অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না, চার মাস আগে সতর্কবার্তা

ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত, বাকি চারজনের ডিএনএ পরীক্ষা

ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত, বাকি চারজনের ডিএনএ পরীক্ষা

গুনে রিসোর্টটি পুরোপুরি পুড়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’। অগ্নিঝুঁকি শনাক্ত করে চার মাস আগে, গত ১১ জুন, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এরপরও চালু ছিল পর্যটকদের আবাসনের এই স্থাপনা।

শনিবার সকালে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ নারী ও পাঁচ বছরের এক শিশুও রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকার তথ্য জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও কীভাবে রিসোর্টটি চালু ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে ঘাটতি ছিল কি না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। বাঁশ ও কাঠের তৈরি তিনতলা স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। একপর্যায়ে রিসোর্টের ভেতর থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহত ছয়জন হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের মরদেহ আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আকতার জানিয়েছেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। আগুন লাগার সময় ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। তবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

এ ঘটনায় আরও ছয়জন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯) রয়েছেন। অন্যরা হলেন মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পড়ে গিয়ে আহত অপর একজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুনের সূত্রপাত, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, রিসোর্টটির অনুমোদন এবং আগের সতর্কবার্তার পরও কার্যক্রম চালু থাকার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।

ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড পর্যটন এলাকার আবাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সরকারি নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অগ্নিঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও কোনো স্থাপনায় পর্যটকদের থাকার সুযোগ কীভাবে অব্যাহত থাকে, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।