মতামত | বিশ্লেষণ

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরলেন চিকিৎসক দম্পতি

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরলেন চিকিৎসক দম্পতি

বেড়াতে এসে আগুনের মুখে, লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচলেন দম্পতি। ছবি সংগৃহীত

ঘুম ভাঙল চিৎকার-চেঁচামেচিতে। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেননি চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন সাদি। স্ত্রী নাফিজা নাওয়ার খান তাঁকে ডেকে জানালেন, রিসোর্টে কোনো সমস্যা হয়েছে। ঘর থেকে বের হতেই চোখে পড়ে আগুন।

মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ধোঁয়া, গ্রাস করছে আগুনের লেলিহান শিখা। নিচে নামার পথও বন্ধ। একদিকে আগুন, অন্যদিকে আটকে পড়ে মৃত্যুর শঙ্কা। কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।

শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে যান বেলকনিতে। নিচে তাকিয়ে দেখেন, প্রাণ বাঁচানোর আর কোনো পথ নেই বললেই চলে। এক মুহূর্ত দেরি না করে বেলকনি থেকে লাফ দেন দুজন। পড়েন পাশের একটি টিনের ঘরের চালে। ভার সইতে না পেরে ভেঙে যায় টিনের চাল। দুজনই পড়ে যান নিচে। আহত হন নাফিজা। শিহাবের হাত ও কাঁধে লাগে আঘাত। তবু শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে যান দুজন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন এই চিকিৎসক দম্পতি। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে মুহূর্তেই তাঁদের ছুটি পরিণত হয় জীবন বাঁচানোর মরিয়া লড়াইয়ে। আগুনের গ্রাস থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও সেই কয়েকটি মুহূর্তের আতঙ্ক কত দিনে কাটবে, তা জানেন না তাঁরা। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, এই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন সাদি বৃহস্পতিবার স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। সমুদ্রঘেঁষা রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন তাঁরা। পরিকল্পনা ছিল, কয়েকটি দিন কাটাবেন আনন্দে, উপভোগ করবেন সমুদ্রের সৌন্দর্য। কিন্তু শনিবার সকালে সেই ভ্রমণই তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময় শিহাব উদ্দিন সাদি বলেন, সকালে তাঁরা দুজনই ঘুমিয়ে ছিলেন। চিৎকার শুনে স্ত্রী তাঁকে ডেকে তোলেন। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে আগুন দেখতে পান তিনি।

“মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে অন্ধকার হয়ে যায়। রিসোর্টটি পুরো কাঠের কাঠামো। দরজা খুলেই দেখি সব পুড়ে গেছে। নিচে নামার পথ নেই। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না,” বলেন শিহাব।

আগুন থেকে বাঁচতে স্ত্রীকে নিয়ে বেলকনিতে ছুটে যান তিনি। কিন্তু সেখানেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। নিচে লাফ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছিলেন না তাঁরা।

শিহাব বলেন, “বেলকনিতে গিয়ে আর কোনো উপায় না দেখে লাফ দিলাম। আমরা একটা টিনের ঘরের ওপর পড়ি। টিন অনেক গরম ছিল। এরপর টিন ভেঙে নিচে পড়ে যাই। আল্লাহর রহমত, জায়গাটা বেশি উঁচু ছিল না। বেঁচে গেছি।”

লাফিয়ে পড়ার সময় নাফিজার পায়ে আঘাত লাগে। শিহাবের হাত ও কাঁধেও আঘাত লাগে। আহত অবস্থাতেও দুজন সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও রিসোর্টে থাকা অন্য পর্যটকদের পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন শিহাব ও তাঁর স্ত্রী। শিহাবের ভাষ্য, রিসোর্টটির আটটি কক্ষই বুক করা ছিল বলে শুনেছিলেন তাঁরা। আগুন লাগার সময় সেখানে থাকা অন্যদের কী হয়েছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন দুজনই।

একটি ছুটি কাটানোর জন্য কক্সবাজারে এসেছিলেন তাঁরা। অথচ সেই ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকল আগুন, ধোঁয়া, আতঙ্ক আর প্রাণ বাঁচাতে বেলকনি থেকে লাফ দেওয়ার অভিজ্ঞতা। শনিবার বিকেলে বিমানযোগে কক্সবাজার ত্যাগ করেন চিকিৎসক দম্পতি। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও রিসোর্টের সেই ভয়াবহ সকালের স্মৃতি তাঁদের কত দিন তাড়া করে বেড়াবে, তা সময়ই বলে দেবে।