সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর : ভূরাজনীতিতে নতুন ভারসাম্যের প্রত্যাশা

Copied
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর : ভূরাজনীতিতে নতুন ভারসাম্যের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর : ভূরাজনীতিতে নতুন ভারসাম্যের প্রত্যাশা। ছবি সংগৃহীত

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলা বাহুল্য, তার এ সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মাইলফলক। প্রধানমন্ত্রীর এই দ্বিমুখী সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ইস্যুগুলো এজেন্ডার শীর্ষে রয়েছে, যার মধ্যে কেবল চীনের সঙ্গেই ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির নানামুখী সংকট, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে এ সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থসংরক্ষণের এক সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনাও বটে।

জানা যায়, সফরের প্রথম ধাপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি মালয়েশিয়ায় গেছেন তারেক রহমান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে তার এ সফরে শ্রমবাজারের শৃঙ্খলা ও আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। মালয়েশিয়ায় আমাদের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) ভিত্তি স্থাপন নিয়ে যে আলোচনার কথা রয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিতে নিশ্চয়ই নতুন গতি সঞ্চার করবে।

সফরের দ্বিতীয় ধাপে চীনের বন্দরনগর দালিয়ান এবং রাজধানী বেইজিং সফরটি বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারকসহ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরের যে প্রস্তুতি, তা বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগের চাহিদাকে আরও বেগবান করবে।

অবশ্য এই দ্বিমুখী ঐতিহাসিক সফরকে সামগ্রিকভাবে সফল ও অর্থবহ করতে হলে কেবল চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই কূটনৈতিক সাফল্যকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমরা মনে করি, অতীতের আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি সমঝোতা স্মারককে যেন দ্রুত ও নিখুঁতভাবে কার্যকর চুক্তিতে রূপ দেওয়া যায়, সেই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিভাগগুলোকে প্রথম দিন থেকেই সক্রিয় ও জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।

কোনো ধরনের ঋণের ফাঁদ, অসম চুক্তি কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে যেন আমাদের চলমান ও ভবিষ্যৎ বৃহৎ প্রকল্পগুলো স্থবির না হয়, তা নিশ্চিত করাও আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই আবশ্যক। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকে কাজে লাগানোর এ সুযোগটি বাংলাদেশকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চপর্যায়ের সফর বৈশ্বিক কূটনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীন, সার্বভৌম ও ভারসাম্যপূর্ণ ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’-নীতিরই এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো যদি সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাদার দক্ষতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই তা দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং একটি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐতিহাসিক অবদান রাখবে।