চারা হারিয়ে যাওয়ার দায় কার?
পরিকল্পনাহীন বৃক্ষরোপণের পরিণতি
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি হয় বনভূমি ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, তবে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
রেলপথ নির্মাণে যে বিপুল পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দিতে ৭ লাখ ২০ হাজার গাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখন বন বিভাগের জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাড়ে চার লাখের বেশি চারার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই তথ্য শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়; এটি আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্ট করে।
প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক চারা কীভাবে হারিয়ে গেল? যদি সত্যিই গরু–ছাগলের কারণে চারা নষ্ট হয়ে থাকে, তবে পাহারার ব্যবস্থা কোথায় ছিল? আর যদি পরিকল্পনাহীনভাবে ঘন করে চারা লাগানো হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল? বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম ছয় ফুট দূরত্ব রাখার কথা থাকলেও অনেক স্থানে দুই থেকে চার ফুট দূরত্বে চারা রোপণ করা হয়েছে। এতে চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রেলওয়ে ও বন বিভাগের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ১০ বছর পরিচর্যার দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল। অথচ পাঁচ বছরের মধ্যেই অধিকাংশ চারা হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে দায়িত্ব নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজকে যদি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হয়, তবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কেবল সংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে; প্রকৃত বন ফিরে আসবে না।
এখন প্রয়োজন দায় নির্ধারণ ও কার্যকর পুনর্মূল্যায়ন। কোথায় কত চারা হারিয়েছে, কেন হারিয়েছে এবং রক্ষণাবেক্ষণে কী ধরনের ঘাটতি ছিল—তা প্রকাশ্যে আনতে হবে। পাশাপাশি বেঁচে থাকা চারাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নতুন করে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিতে হবে।
উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সময় শেষ। টেকসই উন্নয়নের অর্থ হলো অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা। কক্সবাজার রেললাইনের পাশে হারিয়ে যাওয়া চারাগুলো আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।