রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: পাশাপাশি কবরে শায়িত একটি পরিবার
জানাজা শেষ। পাশাপাশি চারটি কবর। একে একে বাবা, মা ও তাদের দুই শিশুসন্তানকে দাফন করা হলো। কক্সবাজারের ইনানী টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে অঙ্গার হন যশোরের মনিরামপুরের নাহিদুর, স্ত্রী আফসানা তানজি ও তাদের দুই মেয়ে। ডিএনএ পরীক্ষার পর পরিচয় নিশ্চিত করে ১১ দিন পর স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয় এই চার মরদেহ।
এরপর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৩টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। এসময় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একসঙ্গে ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ নাহিদের বাবা মতিয়ার রহমান। তাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারও নেই। স্থানীয় বলছিলেন, একসঙ্গে পাশাপাশি ৪টি কবরে কবর দেয়ার এমন দৃশ্য আগে দেখেনি কেউ। এ যেন চারটি মানুষকে নয়, দাফন করা হলো একটি পরিবারকে।
পূজার ছুটিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান নাহিদুর, তার স্ত্রী আফসানা, সাত ও দুই বছর বয়সী ইনায়া ও ইহানা। ১৬ অক্টোবর তারা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। এর আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ওই পরিবারসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে।
গত সোমবার বিকেলে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরিচয় শনাক্ত ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বুধবার সকালে মণিরামপুরের মোহনপুর গ্রামের বাড়িতে চার সদস্যের মরদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে জানাজার প্রস্তুতি। পরে স্থানীয় বাঁধাঘাট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাশাপাশি চার খাটিয়াতে চারটি মরদেহ রেখে তাদের জানাজার নামাজ আদায় করা হয়।
এসময় রাজনীতিক-পেশাজীবী সব স্তরের হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। পরে মরদেহ চারটি নেয়া হয় নাহিদের পারিবারিক কবরস্থানে। সেখানেই তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। নাহিদের মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয় নাহিদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে। এক সঙ্গে একটি পরিবারকে দাফন করতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গোরখোদক রেজাউল।
তিনি বলেন, ‘এত দিন শুধু শুনেছি; একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেয়া হয়। এবার নিজের চোখে ও নিজে একই পরিবারের চারজনের পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়লাম। ৪০ বছরের এই গোরখোদক কাজে এমনটি হয়নি। মনে হচ্ছে চারটি মানুষকে দাফন করছি না; একটি পরিবারকে দাফন করলাম।’
এদিকে স্বজনদের দাবি, অনুমতিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর কারণে আজ তাজা কিছু প্রাণ ঝরে গেল। অবিলম্বে অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাহিদের ফুফা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘সাধারণত যারা কর্মজীবী মানুষ তারা একটু সময় পেলেই বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যায়। কিন্তু সেই রিসোর্টগুলো যদি অনিয়ন্ত্রিত কিংবা অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা যদি না থাকে, তাহলে সেখানে কিন্তু সবসময়ই জীবনের ঝুঁকি থাকে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে এরকম তাজা প্রাণগুলো যে অকালেই ঝরে গেল, এর দায়ভার কে নেবে? আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল, এখন তো আর ফিরে পাব না। তবে এসব অব্যবস্থাপনা সংস্কার ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।'
নিহতের বাবা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার দুটি ছেলে। তার মধ্যে ছোট ছেলের পুরো পরিবার আজ মারা গেল। একে আমি দুর্ঘটনা বলব না। অনুমতিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর কারণে আজ আমার পরিবারের তাজা প্রাণ ঝরে গেল। এই যে রিসোর্টগুলো অস্থায়ীভাবে কাঠের তৈরি। সরকারের কাছে আবেদন, এই সমস্ত রিসোর্ট যেন না থাকে, না থাকে।’
এদিকে দুপুরে নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সমবেদনা জানাতে যান মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সম্রাট হোসেন। তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে একটি পরিবার শেষ হয়ে গেল। নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসন আর্থিক সহায়তা দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
প্রসঙ্গত,নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি।