দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইনের পাশে রোপণ করা ৭ লাখ ২০ হাজার চারার মধ্যে সাড়ে ৪ লাখের বেশি চারার অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে রোপণ করা চারার বড় অংশ উধাও
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে কাটা পড়েছিল পাহাড়, উজাড় হয়েছিল সংরক্ষিত বনভূমি এবং হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ গাছ। সেই পরিবেশগত ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৭ লাখ ২০ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই চারার বড় অংশের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বন বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, রোপণ করা ৪ লাখ ৫৩ হাজার চারার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথের মধ্যে প্রায় ২৭ কিলোমিটার অংশ তিনটি গহিন বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে গেছে। পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়। লক্ষ্য ছিল হারানো প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা।
২০২৬ সালের জুনের শুরুতে বন বিভাগ রেলপথের ১২ কিলোমিটার এলাকায় সাতটি প্লট নির্বাচন করে জরিপ চালায়। জরিপে দেখা যায়, গড়ে মাত্র ৩৭ শতাংশ চারা এখনো টিকে আছে। বেঁচে থাকা চারার প্রায় ৭৫ শতাংশই নিষিদ্ধ ঘোষিত আকাশমণি প্রজাতির।
লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের সুফিনগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রেললাইনের দুই পাশের অধিকাংশ স্থান ফাঁকা পড়ে আছে। ৭১/৪ নম্বর পিলার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় কোথাও কোথাও শতাধিক আকাশমণিগাছ দেখা গেলেও অন্যান্য প্রজাতির চারার উপস্থিতি খুবই কম।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৪৫) বলেন, “কয়েক বছর আগে গাছের চারা লাগাতে দেখেছি। প্রথম দিকে পাহারাদারও ছিল। পরে আর কাউকে দেখা যায়নি। অধিকাংশ চারা মরে গেছে, আর কিছু গরু–ছাগলে খেয়ে ফেলেছে।”
তবে বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জ অফিসের পেছনে, যেখানে হাতির চলাচল ঠেকাতে প্রতিবন্ধকতা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে তুলনামূলক বেশি গাছ টিকে আছে। ওই অংশে আকাশমণির পাশাপাশি অর্জুন, জাম, চালতা, জলপাই ও জারুলের কিছু চারা দেখা গেছে।
রেললাইনের দুই পাশে আটটি সারিতে চারা রোপণ করা হয়। একেক সারিতে একেক প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। দুটি চারার মধ্যকার দূরত্ব কোথাও দেড় থেকে দুই ফুট, কোথাও তিন থেকে চার ফুট। অথচ বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, গাছের চারা রোপণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে চুনতি রেঞ্জ অফিসের পেছনের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় প্রতিবন্ধকতা দেয়াল থাকায় চারা আরও ঘন করে লাগানো হয়েছে।
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক পরামর্শক ছিলেন বন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা তপন কুমার দে। তিনি বলেন, “২০২৫ সাল পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে চারাগুলোর পরিচর্যা করা হয়েছিল। তখন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চারা জীবিত ছিল। পরে রেলওয়েকে পাহারাদার নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়।” স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পাহারার অভাবেই গরু–ছাগলে অধিকাংশ চারা নষ্ট করেছে।
২০২০ সালের জুনে রেলওয়ে ও বন বিভাগের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে রেললাইনের দুই পাশে লাগানো গাছের পরিচর্যার দায়িত্ব ১০ বছরের জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচ বছরের মাথায় অধিকাংশ চারা হারিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির পরিবেশগত সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রেলপথ নির্মাণে যে বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অনিয়মিত পাহারা এবং পরিকল্পনাহীন রোপণের কারণে সেই উদ্যোগ এখন অনেকটাই ব্যর্থতার মুখে। বন বিভাগের জরিপে চারার ব্যাপক অনুপস্থিতি সামনে আসায় পরিবেশ পুনরুদ্ধারের পুরো কার্যক্রম নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।