অনিয়ম ও দুর্নীতি

স্ট্যান্ড রিলিজের সময়সীমা পার হলেও বিমানবন্দরে গোলাম মোর্তজা

Copied
স্ট্যান্ড রিলিজের সময়সীমা পার হলেও বিমানবন্দরে গোলাম মোর্তজা

কক্সবাজার বিমানবন্দর। ছবি সংগৃহীত

বদলির আদেশ অনুযায়ী স্ট্যান্ড রিলিজের সময়সীমা পার হলেও কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন কর্মস্থল ছাড়েননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরের আদেশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করার কথা থাকলেও শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বেবিচক সদর দপ্তর, কুর্মিটোলা, ঢাকা থেকে গত ১৩ আগস্ট জারি করা এক অফিস আদেশে গোলাম মোর্তজা হোসেনকে বেবিচকের এটিএম বিভাগে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই আদেশে চেয়ারম্যান সচিবালয়ের পরিচালক সাবেরা রহমানকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আদেশটির স্মারক নম্বর ৩০.৩১.০০০০.০০০.২১১.১৬.০০০২.২৬.৬৫২।

বেবিচকের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তিরান হোসেন স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ অপরাহ্নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।

তবে নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও গোলাম মোর্তজা হোসেন কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা বা স্থগিত করতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর আগেও তাঁর বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; তবে তদবিরের মাধ্যমে তা ঠেকানো হয়।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি একই কর্মস্থলে রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপক পদটি পরিচালক পদে উন্নীত হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে একজন কর্মকর্তার অবস্থান এবং তাঁর মূল পদ ও বর্তমান দায়িত্বের সামঞ্জস্য বেবিচকের প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
এর মধ্যে গত ১৬ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগপত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়া, ওভারটাইম বণ্টনে অনিয়ম, পছন্দের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত ওভারটাইম দেওয়া, ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং জেনারেটরের সরকারি জ্বালানি ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগপত্রে মাসিক দুই লাখ টাকা উৎকোচ নেওয়া এবং নিয়মিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিকে লাউঞ্জ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ভিআইপি যাত্রীদের নাশতার জন্য অর্থ আদায় এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন সরকারি মালামাল কেনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ না করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

জমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দর এলাকার খতিয়ানভুক্ত জমিতে গত দুই থেকে তিন বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিমানবন্দরের জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন হোটেল-রিসোর্ট মালিক ও এনজিও কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে ভিআইপি সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এর আগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির করে তা ঠেকানো হয়েছিল। এমনকি দুই স্থানীয় বিএনপি নেতাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার মাধ্যমে একজন মন্ত্রীর কাছে তদবির করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলির আদেশ কার্যকর হবে কি না, প্রশ্ন
বেবিচকের সর্বশেষ অফিস আদেশ অনুযায়ী, ২০ আগস্ট বিকেলে গোলাম মোর্তজা হোসেনকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করার কথা। তাঁর স্থলে পরিচালক সাবেরা রহমানকে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অভিযোগকারীরা শুধু বদলির বিষয়টি নয়, গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।