ছদ্মবেশে ডিসি ফরিদা, মাঠে নেমে দেখলেন জনসেবার বাস্তবতা
সরকারি দপ্তরে মানুষ সেবা নিতে গিয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন—এটি জানার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো সাধারণ মানুষের মতো সেই সেবা নেওয়ার চেষ্টা করা। ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানমের ছদ্মবেশে ভূমিসেবা নিতে উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যাওয়ার ঘটনা তাই নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
আজ সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরিদা খানম পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতার মতো ভূমি অফিসে গিয়ে সেবার বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে সেবা নিচ্ছেন, তাঁদের কোনো ধরনের ভোগান্তি বা হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কি না এবং কর্মকর্তাদের আচরণ কেমন—এসব বিষয় তিনি সরেজমিনে দেখার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি সেবার প্রকৃত চিত্র সব সময় অফিসের নথি বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে পুরোপুরি উঠে আসে না।
ভূমি অফিস সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান। জমির নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করসহ নানা প্রয়োজনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে এসব কার্যালয়ে যেতে হয়। সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোথাও যদি অযথা বিলম্ব, হয়রানি, অনিয়ম কিংবা জটিলতা থাকে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
এই বাস্তবতা শুধু কাগজপত্র দেখে বোঝা কঠিন। একজন কর্মকর্তা যখন সাধারণ সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে একটি সরকারি অফিসে যান, তখন তিনি সরাসরি বুঝতে পারেন—একজন নাগরিককে সেবা পেতে কী ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, কতটা সময় লাগছে এবং কোথায় গিয়ে তিনি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ফরিদা খানমের এই উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই। প্রশাসনের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সরাসরি দেখার চেষ্টা করেছেন। সরকারি সেবার মান উন্নত করতে শুধু নির্দেশনা জারি বা সভা-সেমিনার যথেষ্ট নয়; একজন সাধারণ নাগরিক বাস্তবে কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটিও জানা জরুরি।
তবে একটি প্রশ্নও সামনে আসে—এ ধরনের উদ্যোগ কি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই থাকবে, নাকি এটি নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকির অংশ হবে?
প্রশ্নটির গুরুত্ব আছে। কারণ একটি অফিসে একদিনের ছদ্মবেশী পরিদর্শন কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সেবার মানের পূর্ণ চিত্র দিতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের আকস্মিক ও সরেজমিন তদারকি নিয়মিত হলে অনিয়ম বা সেবার ঘাটতি শনাক্ত করার সুযোগ অবশ্যই বাড়ে।
শুধু ভূমি অফিস নয়, পাসপোর্ট অফিস, হাসপাতাল, বিআরটিএ, সমাজসেবা, স্থানীয় প্রশাসনসহ যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি নাগরিকসেবার সঙ্গে যুক্ত, সেসব জায়গাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী আকস্মিক পরিদর্শন করা যেতে পারে। এতে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নীতিনির্ধারকদের কাছে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারে।
তবে তদারকির উদ্দেশ্য শুধু ভুল খুঁজে বের করা হওয়া উচিত নয়। কোথাও অনিয়ম থাকলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যারা আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে মানুষকে সেবা দিচ্ছেন, তাঁদেরও স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি কার্যকর প্রশাসন শুধু শাস্তির মাধ্যমে নয়, ভালো কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমেও শক্তিশালী হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নাগরিকের মর্যাদা। একজন মানুষ সরকারি অফিসে সেবা নিতে গেলে তাঁর মনে হওয়া উচিত—‘আমি সেবা নিতে এসেছি, কারও অনুগ্রহ নিতে নয়।’
এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সুশাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক শর্ত। সরকারি সেবা নাগরিকের অধিকার—এই ধারণা যত বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, সরকারি অফিস ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কও তত বেশি আস্থাভিত্তিক হবে।
সরকার নাগরিকসেবা সহজ ও ডিজিটাল করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কোনো নীতি বা ডিজিটাল ব্যবস্থা কাগজে কতটা সুন্দর, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি বাস্তবে একজন সাধারণ মানুষ কতটা সহজে ব্যবহার করতে পারছেন। নীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় মানুষের অভিজ্ঞতায়।
এখানেই মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার জেলা প্রশাসকের ছদ্মবেশে ভূমিসেবা নেওয়ার ঘটনাটি তাই শুধু একটি ব্যতিক্রমী পরিদর্শনের খবর হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য কিছুটা সীমিত হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হলে মাঝে মাঝে অফিসের চেয়ার ছেড়ে মাঠে যেতে হয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় এবং নিজের চোখে দেখতে হয় নাগরিকরা কীভাবে সরকারি সেবা পাচ্ছেন।
নিয়মিত সরেজমিন তদারকি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং ভালো সেবার স্বীকৃতি—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে সরকারি সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সাফল্য শুধু কতটি সভা হলো, কতটি নির্দেশনা জারি হলো কিংবা কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো—তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি অফিসে গিয়ে কতটা সহজে, সম্মানের সঙ্গে এবং নির্ধারিত সময়ে সেবা পেলেন—সেই অভিজ্ঞতাই প্রশাসনের কার্যকারিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
ছদ্মবেশে একজন জেলা প্রশাসকের ভূমি অফিস পরিদর্শন হয়তো একটি দিনের ঘটনা। কিন্তু এর বার্তাটি বড়—জনগণের সেবা কেমন হচ্ছে, তা জানতে হলে জনগণের জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে হবে। মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে হলে মাঝে মাঝে ক্ষমতার চেয়ার থেকে উঠে মানুষের কাতারে দাঁড়াতে হয়। কারণ প্রশাসনের আসল আয়না কোনো ফাইল নয়—সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা।